06/06/2026 ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বড় বাজেট
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ জুন ২০২৬ ১০:২৬
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এবং রাজস্ব আদায়ের চরম দৈন্যদশায় দেশের অর্থনীতি যখন রীতিমতো ধুঁকছে, ঠিক তখন আসছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট। ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন। এতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর নানা উদ্যোগ থাকবে। পাশাপাশি থাকবে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতি; যা মেটাতে ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা বাজেট বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, অর্থনীতিকে পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থমন্ত্রী নিজেই সম্প্রতি সচিবালয়ে বলেছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই বড় বাজেট করতে হয়েছে।
বাজেটে মোট ব্যয়ের বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা এবং অনুদান নেওয়া হবে ৫ হাজার কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ও উচ্চ খেলাপি ঋণের মধ্যেও সরকারের ঋণনির্ভরতা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বাজেটের আকার বড় হলেও বাস্তবে পুরো অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা সরকারের নেই। বছর শেষে প্রকৃত ব্যয় আরও কম হবে। কারণ ব্যয় করার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। আবার রাজস্ব সংগ্রহও কঠিন হবে। ফলে ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম এ বছর বাজেট একটু ছোট রাখতে। তবে যেহেতু বাজেট বড় করা হয়েছে এখন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং বাস্তবায়নে বেশি নজর দিতে হবে।
এদিকে, বাজেট বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি রাখা হবে। খাদ্যে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, বিদ্যুতে ৩৭ হাজার কোটি এবং অন্যান্য খাতে ২৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়া হবে। সরকার মনে করছে, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করা সম্ভব হবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং সংস্কার ও ব্যবসা সহজীকরণ ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই প্রবৃদ্ধি বাড়ে না। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আহরণের বাস্তবসম্মত কৌশলই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর : বাজেটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও গতিশীল করার উদ্যোগ থাকবে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪.৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬.৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে। অর্থ বিভাগের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি নতুন করে উজ্জীবিত হবে। তবে বৈশ্বিক সংকট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বড় অর্থনৈতিক সমস্যা মূল্যস্ফীতি : গত কয়েক বছর ধরে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সমস্যা মূল্যস্ফীতি। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু একই সময়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম ধাপে ধাপে সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসাবে রাখতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে নিু ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।
সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ অর্থনীতির ভিত্তি : বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ। আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো অব্যাহত থাকবে। খেতাবপ্রাপ‘ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের মাসিক ভাতা কার্যক্রমের আওতায় নতুন করে আরও ১ হাজার ৮৫৭ জনকে ভাতা দেওয়া হবে। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে নতুন বাজেটে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব : বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাত হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা পাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বেড়ে প্রায় ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা হতে পারে।
নতুন সংযোজন সৃজনশীল অর্থনীতি : এবারের বাজেটের একটি নতুন ধারণা হচ্ছে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দিতে বিশেষ তহবিল ও প্রণোদনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার মনে করছে, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রচলিত শিল্প খাতের পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।