ঢাকা | বৃহঃস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২

যেভাবে তৈরি হয় ভোটের ফলাফল

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২৯

ছবি: সংগৃহীত


উৎসবমুখর পরিবেশে সারাদেশে চলছে নির্বাচন। ভোটাররা স্বতস্ফুর্তভাবে ভোট প্রদান করছেন। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বিকাল সালে ৪টা পর্যন্ত চলবে গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ভোট। এরপর গণনা করা হবে ফল।

এবার একই সঙ্গে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় নির্বাচনের ফলে দেরি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। তারা বলছে, দুটি ব্যালটে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনে ফল তৈরিতেও সময় বেশি লাগবে।

তার ওপর এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটার ও দেশের সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার কারণে সেই ব্যালটও গণনা করতে হবে ইসিকে।

২৯৯ সংসদীয় আসনের সাধারণ নির্বাচন, পোস্টাল ব্যালট ও গণভোট ফল আলাদাভাবে গণনা করে তা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন।

বর্তমানে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, ভোটের রেজাল্ট পরিবর্তন করে আরেকজনকে বিজয়ী ঘোষণা করার সুযোগ আছে কিনা অথবা রেজাল্টে কারচুপির সুযোগ আছে কিনা? জবাবে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, নির্বাচনের ফল কয়েকটি ধাপে প্রস্তুত করতে হয়। প্রতিটি কেন্দ্রের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের সামনে ফল গণনা ও ঘোষণা করা হয়। কন্ট্রোলরুমেও আলাদাভাবে ঘোষণা করা হয় প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে।

নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্র ও ফল ঘোষণাকেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্ট উপস্থিত থাকলে কারচুপি বা রেজাল্ট পরিবর্তন কেউ করতে চাইলেও সম্ভব হবে না। তবে অতীতে অনেক সময় বিরোধী এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে কারচুপির অভিযোগ উঠেছে।

সাড়ে ৪টার পরও যদি কোনো কেন্দ্রের ভেতরে ভোটার থাকে, তাহলে সেই কেন্দ্রে ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রতিটি কক্ষের ব্যালটবাক্সগুলো প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনেই লক করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অথবা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা। প্রার্থীদের এজেন্টদের ব্যালটবাক্স ভোটকেন্দ্রের পূর্বনির্ধারিত গণনা কক্ষে নেওয়া হবে।

ভোটগ্রহণের সময় একটি ভোটকেন্দ্রে নারী-পুরুষ আলাদা কয়েকটি কক্ষে ভোট অনুষ্ঠিত হলেও ভোট গণনার জন্য একটি কক্ষ নির্দিষ্টভাবে প্রস্তুত করা হয়। সেই গণনা কক্ষে ওই আসনের প্রতি প্রার্থীর একজন করে পোলিং এজেন্ট উপস্থিত থাকতে পারবে। সেই সঙ্গে সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকরাও উপস্থিত থাকতে পারবেন। তাদের সামনেই যে ব্যালটবাক্সগুলোতে ভোট দেওয়া হয়েছে, সেগুলো খোলা হবে, তাদের সামনেই বক্স নম্বর ও লক নম্বর মিলিয়ে নেওয়া হবে।

এরপর প্রতি কক্ষের ব্যালটবাক্সগুলো একটা একটা করে লক খুলে ব্যালট পেপারগুলো মেঝেতে ঢালা হবে। এরপর পোলিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ভোট গণনা শুরু করবেন।

এরপর সংসদ নির্বাচনের সাদা ব্যালট আর গণভোটের গোলাপি ব্যালট আলাদা করে ফেলবেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা।

নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র অতিরিক্ত সচিব মতিয়ূর রহমান বলেন, আলাদা দুই ধরনের ব্যালট বান্ডিল করতে যদি দেখা যায় যে কোনোটি ছেঁড়া বা সঠিকভাবে সিল দেওয়া হয়নি, সেই ব্যালটগুলো আলাদা করা হবে। এ ছাড়া যদি কোনো ব্যালটে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর না থাকে, সেগুলোও বাতিল ব্যালট হিসেবে গণ্য হবে।

এরপর প্রতীকভিত্তিক আলাদাভাবে টালি করে গণনা করা হবে ব্যালট। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা নির্ভুলভাবে গণনা করা। একই সময় গণভোটের আলাদা ব্যালটগুলোও হ্যাঁ এবং না- দুই ভাগে আলাদা করে সেগুলো সঠিকভাবে গণনা করবেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক ইসি কর্মকর্তা জেসমিন টুলী বলেন, এবারের নির্বাচনে দুইটি ব্যালট থাকায় গণনা ও ফল ঘোষণায় দেরি হতে পারে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে যদি দুই ধরনের ব্যালট দুটি টিম করে গণনা করা হয় তাহলে এক্ষেত্রে খুব একটা দেরি হওয়ার সুযোগ নেই।

দুটি ব্যালট আলাদাভাবে গণনা শেষে নির্বাচন কমিশনের সুনির্দিষ্ট ফরমে কেন্দ্রভিত্তিক রেজাল্ট শিট প্রস্তুত করা হবে। সংসদ নির্বাচনের জন্য ১৬ নম্বর ফরমের যে রেজাল্ট শিটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম, ভোটের সংখ্যা, বাতিল ভোটের সংখ্যা, মোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা স্পষ্ট করে লিখতে হয়।

নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা মতিয়ূর রহমান বলেন, রেজাল্ট শিটে ভোটের সংখ্যা অংকে ও কথায় দুভাবেই লিখতে হয়। কোনোভাবেই শুধু অংকে লেখা যাবে না; কোনোভাবেই কাটাছেঁড়া করা যাবে না। এতে রেজাল্ট নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

এই রেজাল্ট শিটে মোট ভোট সংখ্যা, বাতিল ভোটের সংখ্যা, বৈধ ভোটের সংখ্যা ও প্রার্থীদের ভোটের সংখ্যা সব কিছুর মোট প্রদত্ত ভোটের সঙ্গে মিল থাকতে হবে। এই রেজাল্ট শিট প্রস্তুত হওয়ার পর তাতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টরা স্বাক্ষর করবেন। এরপর চূড়ান্ত ফলের সাতটি সেট প্রস্তুত করতে হয়।

সেখান থেকে একটি কপি ভোটকেন্দ্রের নোটিশ বোর্ড কিংবা কেন্দ্রের উন্মুক্ত স্থানে টাঙিয়ে দেবেন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা। বাকি সেটগুলোর মধ্যে দুটি সেট কেন্দ্রের ব্যালট ও নির্বাচনি সরঞ্জাম যে বস্তায় রাখা হয়, সেই বস্তার মধ্যে দুটি কপি রেখে বস্তাটি সিলগালা করা হবে। দুটি কপি প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হাতে করে নিয়ে যাবেন সংশ্লিষ্ট আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার (জেলা প্রশাসক/বিভাগীয় কমিশনার/আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা) কাছে।

কেন্দ্রের রেজাল্টের আরেকটি কপি প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিজের কাছে রাখবেন, আরেকটি সেট তিনি নির্দিষ্ট খামে পাঠিয়ে দেবেন নির্বাচন কমিশনে। এর বাইরেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্ট, সাংবাদিক কিংবা পর্যবেক্ষকদের কেউ যদি কেন্দ্রের ফলের কপি চান, সেটি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়ে থাকে।

এভাবে বিভিন্ন কেন্দ্রের ফল সংগ্রহ করে নির্বাচনি অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগেই জয়-পরাজয় সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে থাকেন।

এই কার্যক্রম শেষে সরাসরি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও অন্তত দুজন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং পুলিশ ও আনসারের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়/নির্বাচনি কন্ট্রোলরুমে চলে যাবেন।

সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা/উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা) কার্যালয়ে ফলের কপি এবং গণনাকৃত ব্যালট জমা দেবেন। এই রেজাল্ট পাওয়ার পর সেটি সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের কন্ট্রোলরুম থেকে কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রার্থীর এজেন্টদের উপস্থিতিতে মাইকে ঘোষণা করবেন।

কোনো কেন্দ্রের ফল মাইকে ঘোষণার আগে পর্যন্ত সেখানে ওই কেন্দ্রে থাকতে হবে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে।

কেন্দ্র থেকে ফল আসার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা কেন্দ্রভিত্তিক ফলের সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের ভোটও গণনায় যুক্ত করবেন। পোস্টাল ব্যালটের খাম যখন খোলা হবে, তখনো সেখানে ওই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট উপস্থিত থাকবেন। এজেন্টদের সামনেই খোলা হবে পোস্টাল ব্যালট। সেই ব্যালটও একইভাবে গণনা করে আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ফল প্রস্তুত করা হবে।

চূড়ান্ত ফল রিটার্নিং কর্মকর্তা কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করবেন। সেখানে প্রার্থীদের এজেন্ট কিংবা প্রার্থীরাও উপস্থিত থাকতে পারবেন। যদি গণনা বা রেজাল্ট নিয়ে কোনো প্রার্থীর আপত্তি থাকে, তাহলে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনঃগণনার আবেদন করতে পারেন। যদি কমিশন অনুমতি দেয় তাহলেই কেবল পুনঃগণনা করা হতে পারে।

এ ছাড়া যদি কোনো প্রার্থীর এই ফল নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে ভোট শেষ হওয়ার পরেই নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে এ নিয়ে মামলা করতে পারবেন।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by DATA Envelope
Top